flag

flag
Dooars Day, Ours Day.

ডুয়ার্স, আমার প্রিয় ডুয়ার্স - গৌতম চক্রবর্তী

 


ডুয়ার্স, আমার প্রিয় ডুয়ার্স - গৌতম চক্রবর্তী
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন শ্বাপদসংকুল, দূর্গম, বিরল জনবসতি অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে অরণ্যচারী কিরাত অধ্যুষিত এক পাণ্ডববর্জিত দেশ ছিল ডুয়ার্স ডুয়ার্সের এই অঞ্চল অতীতে ছিল কুমারী অরণ্য যা ছিল মূলত অরণ্যচারীদের, যারা কৃষিকাজ জানত না এবং মৎস্য ও পশু শিকার ছিল উপজীবিকা বাস করত গাছের ওপর বাড়ি বানিয়ে পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে মেচ, রাভা, টোটো, ভুটিয়া, নেপালি ইত্যাদি জনজাতি এবং রাজবংশীরা বসতি স্থাপন করে এই জনজাতি হল ইন্দো-মঙ্গোলয়েড, ভোট চিনিয়, ভোট বর্মী, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় জাতিসমূহ যাদের অস্তিত্ব ছড়িয়ে আছে স্থান নামে কাঠামবাড়ি নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে মেচ পদবী বাগরাকোট, ডালিমকোট ভুটিয়া শব্দনীলাম্বরে মেঘপুঞ্জের আপন খেয়ালে বিচরণ ও চোখ জুড়ানো সবুজ প্রান্তর এর সমাহার এবং নব যৌবনে উতলা স্বপ্নীল ভূমিপুত্রের ডুয়ার্স আপন বৈশিষ্ট্য নিয়েই মানববন্ধন রচনা করেছেউত্তরের সংস্কৃতিতে কোনদিন  মলিনতা ছিল না, ছিল অন্তরের টান ভূমিপুত্রদের স্বচ্ছল অবস্থা না থাকলেও মন ছিল উদার, কলুষমুক্ত মধুর ব্যবহার, সরলতা, মানবিকতা এবং অতিথিপরায়ণতা ছিলো উত্তরের ভূমিপুত্রদের প্রাণের সম্পদ অকৃপণ ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগুলিতে মুক্ত হাওয়া, সুন্দর প্রকৃতি এবং সবুজের সমারোহে প্রাকৃতিক নিয়মেই ভূমিপুত্ররা হয়ে উঠত সহজ-সরল সুস্বাদু সাধারণ মানের খাদ্যবস্তু গ্রহণ করে মনের আনন্দে ভূমিপুত্ররা গান বাঁধতো, গান গাইতো তাদের গানবাজনাতে থাকত প্রকৃতির মাধুর্য এবং প্রাণ মনকে স্পর্শ করা সুর যা মনকে প্রাণবন্ত করে তুলতআদিম জনজাতির শান্তিপূর্ণ সহ নিবাসস্থল রূপে পরিগণিত ডুয়ার্স নানা সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং মহামিলনের পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে সব মিলিয়ে ডুয়ার্স যেন সহানুভূতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা এবং স্বার্থত্যাগের জ্বলন্ত নিদর্শন
দেখতে দেখতে ডুয়ার্সের দেড়শো বছর হয়ে গেলো জেলাও ভেঙে হল একটি থেকে দুটি কত রাজা মহারাজা, বিদেশী শক্তির উত্থান পতনের ইতিহাস ডুয়ার্স জুড়ে ডুয়ার্সের শান্তিপ্রিয় এবং স্বাধীনচেতা প্রাচীন জনজাতিদের কৃষিজমি অধিকার করে, হাজার হাজার একর জমির বন-জঙ্গল উচ্ছেদ করে চা শিল্পের প্রসার ঘটানোর স্বার্থে চা বাগানকে কেন্দ্র করে সুদূর অতীতে মানুষ এসেছে নেপাল, ভুটান এবং তিব্বত থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্রুতহারে একের পর এক চা বাগান গড়তে থাকলে ছোটোনাগপুর এবং সাঁওতাল পরগনা থেকে মুন্ডা, ওঁরাও, সাঁওতাল ইত্যাদি উপজাতির মানুষেরা আসেন জীবিকার সন্ধানেমেচ, রাভা, কোচ, টোটো, রাজবংশী ইত্যাদি বিচিত্র জনজাতি এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের সংমিশ্রণে উত্তরবঙ্গে তৈরি হয় লোকায়ত সংস্কৃতির রূপরেখা। স্বাধীনতা এবং দেশভাগের পরবর্তীকালে জলপাইগুড়ি জেলা তথা তরাই ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ সীমানা জুড়ে কয়েক লক্ষ হিন্দু বাঙালী ছিন্নমূল উদ্বাস্তৃ হয়ে আশ্রয় নেয় ডুয়ার্সে জেলা শহরে, মফস্বলে, গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্রই ছিল জন্মভূমি থেকে বিতারিত হওয়ার আর্তি এবং সর্বস্ব হারানোর দু:, কান্না, শোক, হাহাকার ক্রমশ: জীবন নতুন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিবর্তিত হতে থাকে জঙ্গলে জঙ্গলে ছাওয়া গঞ্জ ভরে ওঠে বাইরে থেকে আসা লোকের আগমনে চা বাগানে গড়ে ওঠে বসতিবাড়তে থাকে ডুয়ার্সের আর্থ সামাজিক উন্নতির সম্ভাবনা প্রেম এবং প্রতিবাদ মিশে যায় উত্তরের জীবনধারায়, নাচে-গানে, শিল্প সংস্কৃতি ও ভাষাতে ডুয়ার্সকে ভালোবেসেছিলেন স্যান্ডার্স সাহেব তাঁর সেটেলমেন্ট রিপোর্ট ডুয়ার্স বিষয়ক মূলবান দলিল শুধুমাত্র জমির জরিপ হিসাব নিকাশ নয়, ডুয়ার্সের নিসর্গ চিত্র, এই অঞ্চলের মানুষের কথাও উল্লেখ রয়েছে আছে সিঞ্চুলা পাহাড়ের সৌন্দর্য বক্সার রোমাঞ্চ, প্রজাপতি, কীটপতঙ্গ, দুর্লভ অর্কিডসবার কথাই, সযত্নে


দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ গালিচা আর নীল পাহাড়ের ডুয়ার্সের ডাক চুম্বকের মতন আকর্ষণ করে প্রতিমুহুর্তে হিমালয়ের টানে একবার যে মজেছে, সে যেমন বারবার হিমালয়ের পথে ছুটে যায়, ডুয়ার্সের ডাক তেমনই মোহময়ী এ যেন নিশি-ডাকের মতনডুয়ার্স ভ্রমণ অনবদ্য ছন্দে আমাকে উজ্জীবিত করে বার বার মনে হয় স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে যেন আরও নতুন কিছুর সন্ধান পাচ্ছি অনাবিল আনন্দ আর সুখে পুলকিত হই যতবার ডুয়ার্সে আসি অজানাকে জানার আগ্রহ আর অদেখাকে দেখার তীব্র আকাঙ্খা পূরণে চূড়ান্তভাবে মুখিয়ে থাকি  হিমালয়ের পাদদেশে পশ্চিম বাংলার উত্তর সীমান্তে তরাই অঞ্চল ডুয়ার্স পাহাড়, নদী, ঝরনা, গভীর অরণ্য ও সবুজে সম্ম্মোহিত দিগন্ত বিস্তৃত চা-বাগানগুলি ডুয়ার্সের বৈশিষ্ট্য ডুয়ার্সে রয়েছে ভেষজ গুল্মের অফুরন্ত ভাণ্ডার সর্পগন্ধা, শতমূলী, কালোমেঘ, পিপুল, আমলকী, বহেরা, রিঠার একচ্ছত্র সাম্রাজ্য বৈচিত্র্যময় ডুয়ার্সের নীল আকাশে সবুজ রঙের বনটিয়ার ঝাঁক এককালের পাণ্ডববর্জিত দেশ, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়ার ডিপো ছিল ডুয়ার্স সন্ধ্যা হলেই বাঘের ডাক বৃষ্টি! বৃষ্টি! বৃষ্টি দিনের বেলাতেও পাগল করে দিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় বর্ষায় ডুয়ার্স সত্যিই পর্যটনময় রবীন্দ্রনাথ যদি ডুয়ার্সের বর্ষা কখনো দেখতেন, তবে রাবীন্দ্রিক সুর নিশ্চয়ই এতটা মোলায়েম হত না মেঘমল্লার পরিণত হত মেঘমুষলে বস্তুত ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকার পশ্চাদভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড বলা যায় ভুটান পাহাড় আয়তনে ডুয়ার্স ৪,৭৫০ বর্গ কিলোমিটার ,২৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে নিবিড় অরণ্য বেশিরভাগ চা-বাগান তিস্তার পশ্চিম দিকে, পূর্ব দিকে অরণ্য-ভূভাগ ১৫২ টির ওপর চা-বাগিচা ডুয়ার্সের বুকে এবং বেশিরভাগ অঞ্চলটাই পড়েছে জলপাইগুড়ি জেলায় ডুয়ার্স শব্দটির অর্থ দরজা ভুটান পাহাড় থেকে ১৮ টি দরজা পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথ বেয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমতলে মিশেছে ১১ টি পশ্চিমবঙ্গে, বাকি ৭টি অসমে অতীতে ওসব পথে ভুটানিজরা সমতলে ঢুকে ব্যবসা-বাণিজ্য, সাম্রাজ্য বিস্তার করত রেনিরস্টোরি অফ দ্য ডুয়ার্স ওয়ার’ (১৮৬৬) থেকে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়


ডুয়ার্স ভ্রমণে অরণ্য, চা-বাগান আর বন্য পশুপাখি ও আদিবাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার ঘটনা আমাকে পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যকে অনুভব করতে সাহায্য করে অরণ্যের মধ্য দিয়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর নানা রকমের পশুপাখিদের গানে গানে কেটে যায় সময় ডুয়ার্সের পথে যে সকল চা-বাগান আর অরণ্য দেখতে পাওয়া যায় তা যেন ছবির মত চা বাগান পত্তনের পর থেকেই ডুয়ার্সের আমূল পরিবর্তন হতে থাকে। স্থানীয় মঙ্গোলীয় জাতির জনগণ পরের অধীনে শ্রমিক হিসেবে চা বাগানে কাজ করার পক্ষপাতী ছিল না। অনুরূপ পরিস্থিতিতে চা শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। চা-বাগানের পত্তন আর ভুটান তিব্বতের সঙ্গে ইংরেজদের বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর চা বাগান অনুসারী কলকারখানায় কর্মসংস্থান হয়। এদের সাথে মিশেছে দেশবিভাগের পর আগত উদ্বাস্তু বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। বিভিন্ন স্থান থেকে এসে তারা আপন করে নিয়েছে উত্তরের মৃত্তিকাকে। পার্থক্য শুধু একটাই কাগুজে ছবিগুলো স্থির আর অরণ্যের দৃশ্যাবলী প্রকৃতির সান্নিধ্যে আপন মনে খেলা করে দূর্দান্ত ভাল লাগা কাজ করে মনটা মুহূর্তেই উজ্জীবিত হয়ে যায় অরণ্যের মধ্য দিয়ে রাস্তায় কখনও হাতি, বানর কিংবা পশু পাখিদের অবাধ বিচরণ দেখে হৃদয়ের সবকটা জানালা খুলে যায় ডুয়ার্সের এই অসাধারণ দৃশ্য না দেখলে ডুয়ার্সকে চেনা মুশকিল কোথাও হাতির পাল, কোথাও বাইসন কিংবা গন্ডারদের অবাধ চলাফেরা দেখতে দেখতে কখন যে চলে আসি ময়ুরের দেশে বুঝতেই পারি না এখানকার ঘন অরণ্যে বন্য পশুপাখি দেখার জন্য কখনও ওয়াচ টাওয়ারে, আবার কখনও খোলা জিপে দাঁড়িয়ে কল্পনার জগতে অবগাহন করি এই অরণ্যে এসে আলো আঁধারির খেলায় পাখিদের কলরবে কেটে যায় কত সময় কত রকমের ফুল-ফল আর সবুজের সমাহার বলে শেষ করা যাবে না উত্তরের সংস্কৃতিতে মাটির সোঁদা গন্ধ বহু বৈচিত্র্যে বর্ণময় ডুয়ার্স যে ছবির মতই সুন্দর

নানা জাতির সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ডুয়ার্সের সংস্কৃতি তাই তো নিশীথে দূর কোন চা বাগান থেকে ভেসে আসা মাদল এবং আদিবাসী সঙ্গীতের সুরধ্বনি আজও আমাদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায় বহুকাল আগে থেকেই এই অঞ্চলে নারীরা স্বাধীন বৈদেশিয়া বা পরদেশি বন্ধুর প্রতি তাদের প্রেম নিবেদনে নিঃসঙ্কোচ তাদের চোখে পরদেশি পুরুষেরা রসিক এবং যে কোন নবাগত ভিনদেশী মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে আগ্রহী ছিল তারা উত্তরের সংস্কৃতিতে মাটির সোঁদা গন্ধ কৃষকের জীবনে বাঁশের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সৃষ্টি হয়েছিল মদনকাম ঠাকুরের পুজো নানান রঙের কাপড় পেঁচিয়ে লম্বা বাঁশের মাথায় চামর লাগিয়ে পতাকার মত বহন করে গান গাইতে গাইতে দলগুলি হাটে জড়ো হত বৈশাখ মাসের দিকে একটি কালো রঙের ছাতায় সাদা রঙের আল্পনা এঁকে কাঠিগুলিকে শলার ফুলে সাজিয়ে তিস্তাবুড়ির পুজোর গানের দলের মহিলারা গ্রামে মাগন তুলে বেড়াতেন উঠানে তুলসীতলার সামনে লেপাপোছা করে জল ঢেলে সেখানে একটি বড় পিড়িতে ছাতাটি রেখে গান ধরা হত উত্তর বাংলার গ্রামেও ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মতই বিয়ের গানের চল ছিল বরযাত্রী এবং বরের সাহায্যকারিনী বৈরাতিদের উদ্দেশ্যে কনেপক্ষের লোকজনেরা গানের সুরেই ছড়া কেটে নাস্তানাবুদ করে দিতেন বরপক্ষের লোকেরাও কনেপক্ষের আত্মীয় স্বজনের নাম উল্লেখ করে নানাপ্রকার কটু মন্তব্য করতেন হাজার ছড়া, গান এবং লোককথা উত্তর বাংলায় প্রচলিত ছিল আধুনিক শহরের লিঙ্গ বৈষম্যের ধারণা এবং সমস্যা একটা সময়ে ডুয়ার্সে কেউ কল্পনাও করেনি সারাদিন খেতে কাজ করা পুরুষ বা মহিলাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না কোনদিন, আজও নেই স্থানীয় মানুষ মানবিক মূল্যবোধের উজ্জ্বল প্রকাশে জমি, শ্রম, অর্থ, ও পুঁজির সাহায্যে ছিন্নমূল মানুষের মিছিলকে বন্ধুত্ব এবং আত্মীয়তায় বাঁধতে চেয়েছে জীবন যাপনের যাবতীয় প্রকাশ ভঙ্গীতে নারী এবং পুরুষের সমানাধিকার এবং মর্যাদাবোধ পরিবার এবং সামাজিক জীবনে জড়িয়ে থাকত


আদিম জনজাতির শান্তিপূর্ণ সহ নিবাসস্থল রূপে পরিগণিত ডুয়ার্স নানা সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং মহামিলনের পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে মেচ, টোটো, ওঁরাও, মুন্ডা, ডুকপা, রাভারা কেউ বা ঘন শ্যাম অবার কেউ বা ফর্সা বেশভূষা ভিন্নতর  সব মিলিয়ে ডুয়ার্স যেন সহানুভূতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা এবং স্বার্থত্যাগের জ্বলন্ত নিদর্শন বহুকাল আগে থেকেই এই অঞ্চলে নারীরা স্বাধীন বৈদেশিয়া বা পরদেশি বন্ধুর প্রতি তাদের প্রেম নিবেদনে নিঃসঙ্কোচ তাদের চোখে পরদেশি পুরুষেরা রসিক এবং যে কোন নবাগত ভিনদেশী মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে আগ্রহী ছিল তারা গ্রামের সবুজ আঁচলের আদিগন্ত প্রকৃতি, ধানখেত, খালবিল, সরু আল, হলুদ সরষে ফুলের মেলা, সপ্তাহের হাটবার, হাটের মিষ্টি, গজা, জিলিপি, তেলেভাজা, জ্যান্ত ছোট মাছ নিয়েই ডুয়ার্স তথা জলপাইগুড়ির গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ শ্রম নির্ভর জীবনে পরতে পরতে নারী পুরুষের সমান অবদান ছিল নারী পুরুষ নির্বিশেষে এক সঙ্গেই রাত জেগে জীবন যুদ্ধে সামিল হয়েছে উত্তরের ভূমিপুত্ররা ছোট ছোট সুখ দু:খের মধ্যেই সহস্রাব্দের চেনা রাস্তায় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে যেতে থাকে বাবা মহাকালেরা গ্রাম্য ভোকাবুলারিতে ঢুকে পড়ে কালাশনিকভ ফলিডল খেয়ে নদী থেকে লোপাট হয়ে যায় মহাশোল, চা বাগানে আর সেনা ছাউনিতে ধরা পড়ে আনস্মার্ট চিতা, তিস্তার শুশুক কোথায় যেন পাড়ি জমায়, লোকগানে ঢুকে পড়ে সিন্থেসাইসার তবুও জীবন্ত লোক ইতিহাস তৈরী হতে থাকে জল, জঙ্গল, জমি আর ম্যালেরিয়াকে পোষ মানাতে মানাতে বর্ষা ভেজা রাতে কাথার আরামে ডুবে যেতে যেতে, শীত-সকালের রোদ গায়ে মেখে আমাদের বেঁচে থাকাকে লিপিবদ্ধ করতে করতে তাই এই ভূমির জীবন চর্চার অশরীরী ছাপ শৈব সংস্কৃতি হয়ে নিয়তির মত নির্ভূলভাবে এঁটে বসেছে গোটা বঙ্গদেশের শৈবচর্চায় তাই এই টান, এই অলৌকিক ভালবাসা কখনো শেষ হয় না

আজও দক্ষিণ সাতালিতে মেচ রমণীরা সেই প্রাচীন রীতিতেই বুনে চলেছে রঙিন সুতোর কাপড় ভুটানি বৃদ্ধার হাতে জপমালা, কপালে বলিরেখা, লালচে ফোকলা মুখে আন্তরিক হাসি বাসের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে ওঁরাও রমনী পিঠে চা পাতার ঝুড়ি বাধার ঢঙে সাদা কাপড়ে বাঁধা ঘুমন্ত শিশু ইতিহাসখ্যাত “বক্সা ফোর্ট” এর ওপরে সাতখানা গ্রাম নিয়ে ভূমিপুত্র ডুকপাদের আবাসভূমি ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে আজও টিকে আছেকোট শব্দের অর্থ দূর্গ ডামডিম শব্দের অর্থ ভুটিয়া ভাষায় ছোট গ্রাম ভোটপট্টি ভুটিয়াদের অস্তিত্ব নির্দেশ করে দ্রাবিড় শব্দে গুড়ির অর্থ গঞ্জ ভূমিপুত্র টোটোরা আজও মাদারিহাট থেকে কিছু দূরে সংসার করছে অনেক কমে গেছে গারো উপজাতির মানুষের সংখ্যা নিজেদের নৃত্যকলা, সংস্কৃতিতে পৃথিবীর সমস্ত লোকসংস্কৃতি প্রেমিক মানুষকে রাভা জনজাতি মুগ্ধ করেছে লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে লেপচাদের অবদান অবিস্মরণীয় ভূমিপুত্র লেপচা জাতিকে তাদের ভূমিতে আর প্রায় দেখা যায় না কালের গ্রাসে ভূমিপুত্র লেপচারা হারিয়ে যাচ্ছে যেখানে তারা আগে থাকত এখন সেখানে প্রচুর নেপালি জনজাতি জমি কিনে ঘর বেঁধেছে সেই মন উদাস করা সুর, সেই গান আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টেছে এবং পাল্টাচ্ছে ভূমিপুত্রদের সরলতা, উদারতা এবং মানবতার খোঁজ আমরা আর পাই না প্রকৃতিদেবী উদ্যান এবং বনাঞ্চলকে সাজিয়েছিলেন গাছপালা দিয়ে পরে জীবজন্তু সৃষ্টি করে সবরকম সুবিধার ব্যবস্থা করে শেষে মানুষকে পাঠিয়েছিলেন সভ্যতার বনিয়াদ রচনা করতে কিন্তু স্বার্থপর মানুষ পরশুরামের মতো প্রকৃতির নিধনে মেতে উঠলো এভাবে অরণ্য নিধন হলে তার ফল কখনোই শুভ হতে পারে না তাই প্রকৃতির অভিশাপে উত্তরের জীবন মাঝে মধ্যেই বিপন্ন হয়ে উঠছে

পর্যটনের অসাধারণ উপাদান ছড়িয়ে আছে তরাই এবং ডুয়ার্সে তিস্তা, লিস, ঘীস, চেল, কুমলাই, মাল, নেওড়া, ধরলা নদীধৌত অঞ্চল বর্ষাকালে অসংখ্য ঝোরা থেকে জলধারা সৃষ্টি হয় উত্তরে ভুটান পাহাড় পরিষ্কার আবহাওয়ায় উত্তর-পশ্চিমে উঁকি দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারমৌলি শীর্ষ শৃঙ্গ পার্বত্য অঞ্চল, উচ্চভূমি এবং সমতলভূমিতে সবুজের সমারোহ সবুজ চা বাগিচার বিস্তার, সমতলে ধানের ক্ষেত ও সুপারি গাছের সারি, পাহাড়ের গায়ে ধাপচাষ এবং ঘন অরণ্যে শাল, সেগুন, শিশু বৃক্ষের সারি প্রবল বর্ষা এবং প্রবল শীত ছিল এই অঞ্চলের প্রধান ঋতু উত্তরের অরণ্যের সবুজের ফাঁক দিয়ে মেঘের কেশর ওড়ে পাহাড়ের গ্রীবায়, জঙ্ঘায়, স্কন্ধে পাহাড় অদৃশ্য হয়ে যায় ঠিক তখনই ডামডিম থেকে সামসিং, আংড়াভাসা থেকে আলাইকুড়ি, তোড়লপাড়া থেকে তুরতুরি, ভোটপট্টি থেকে ভুটানঘাট, রাঙ্গালিবাজনা থেকে রাজাভাতখাওয়া, হান্টুপাড়া, গারোপাড়া, বক্সা পাহাড়, খট্টিমারির জঙ্গলে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া জনজাতি তাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি নিয়ে আর হারিয়ে যাওয়া জনপদ তাদের ঐতিহ্য নিয়ে নিমেষে হুংকার দিয়ে ওঠে ঠিক তখনি সংকোশের বোহেমিয়ান তরঙ্গ ছলছল করে বয়ে যায় নিউল্যান্ডস চা বাগানে বর্ষার চুপ দুপুরে পাতাতোলা মেয়েরা বস্তিতে ফিরে গেলে শেড ট্রি থেকে যখন টুপটাপ বৃষ্টি ঝড়ে, তখন দিগন্তজোড়া নিউল্যান্ডস এর দূরে দূরে কাঠের বাড়িগুলির সামনের ক্ষেতে বিপজ্জনক কালচে সবুজ এবং দূর্ভেদ্য অরণ্য থেকে এ রকমই কোন এক বৃষ্টির দুপুরে হরিণের ঝাঁক এসে কুমড়ো খেয়ে যায় রাতে এসে হাতি খড়ের ঘরের থাম নাড়ায় সেই মন উদাস করা সুর, সেই গান আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টেছে এবং পাল্টাচ্ছে

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে ডুয়ার্সে পলাশবাড়ী চা বাগান হয়ে ভুটানের প্রান্তিক শহরে সেই কোনকালে বৈজয়ন্তীমালা এবং অশোককুমারকে নিয়ে শুটিং হয়েছিল হিন্দি ছবি তপন সিংহের হাটে বাজারেরযার লোকেশন ছিল উত্তরবঙ্গ তারপর থেকে দীর্ঘ সময় জলপাইগুড়ি জেলায় কোন শুটিং হয়নি দীলিপকুমার, সায়রা বানুরসাগিনা মাহাতোসেলুলয়েডে বন্দী করেছিল উত্তরবঙ্গকে উত্তমকুমারেরধনরাজ তামাংবা অমিতাভ বচ্চনেরঅনুসন্ধানদেশ বিদেশের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো তরাই এবং ডুয়ার্সের সঙ্গে পরবর্তীকালে উত্তরের মাটির সোঁদা গন্ধ বুকে নিয়ে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকারউপন্যাসটি দূরদর্শনের জন্য সিরিয়াল হিসাবে শুটিং হয় উত্তরবঙ্গে উত্তরাধিকারের প্রথম পর্বের প্রথম দৃশ্যে ডায়না নদীর ধারে দাদু নাতির হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল ওই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কালপুরুষএবং সাতকাহনসিরিয়ালের শুটিং হয়েছিল উত্তরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে সাথী করে পরবর্তীকালে অপর্ণা সেন, রাজা সেন, গৌতম ঘোষেরা আবার  শুটিং করার ফলে ছিন্নমূল জননীর মতই ডুয়ার্সের বনজ্যোৎস্নায় ভারতীয় আর্ট ফিল্ম তার কাঁচামাল খুঁজে পায় গরুমারা বনবাংলোয় দেশ দেশান্তরী পাখির কুজনে আবার অরণ্যেপ্রাণ ফিরে পায় গরুমারার আলো-আঁধারিতে মিস্টার এন্ড মিসেস আয়ারডুয়ার্সের মায়াময় সৌন্দর্য্যে ডুবে যায় তিস্তার নীলচে-সবুজ জলধারা, মূর্তির পারে রংবেরঙের প্রজাপতির ঝাঁক, অপর পারে হরিণ-হরিণীর চকিত চলাচল, জোৎস্না রাতের মায়াময়ী তিস্তা ডুয়ার্সের অপার সৌন্দর্য রচনা করে যা বর্ণনায় বুঝানো খুবই কষ্টকর মালবাজার, মূর্তি থেকে চালসা, মেটেলি, লাটাগুড়ির অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে হাজার হাজার মানুষ এই ভার্জিন বিউটিকে উপভোগ করতে উত্তরের মাটিতে আসতে শুরু করেন প্রতিবছরই



আমরা রোজ কোন না কোন সময় সূর্যাস্ত দেখি কিন্তু বছরের কোনও গোধুলির সূর্য ডুবে যাওয়ার রঙ অন্য কোনও দিনের মত হয় না প্রতিদিনের রঙের খেলা আলাদা আলাদা এটাই আমাদের উত্তরের শেষ বেলার আকাশ প্রকৃতি অসাধারণ এক পেন্টার এখানে সূর্যাস্তের আকাশ দেখার সবচেয়ে ভাল জায়গাটি আবিষ্কার করেছিলাম ডুয়ার্সে গয়েরকাটা চা-বাগানের প্রান্তে গিয়ে এই আকাশ দেখেছিলাম বাগান শেষ, তারপর একফালি নদী, উপত্যকার মত অনেকটা সবুজ জমি, তার ওপারে মরাঘাট বন বনের মাথার আকাশ অন্যরকম হয়ে যায় খন ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায় একদিনের সঙ্গে অন্য দিনের মিল থাকে না উজ্জ্বল থেকে শান্ত, তারপর ক্রমে ম্লা আরও ম্লান ডুয়ার্সের আকাশ একসময় বিষন্নতা আঁকতে আঁকতে চলে যায় ডুয়ার্সের গোধূলি মনের সমস্ত মলিনতা ধূইয়ে দেয় রাত্রি গভীর হয়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ডুয়ার্সের আরেক রূপ। পরিবর্তনশীল জগতে উদারমনা ডুয়ার্স কাউকে ফিরিয়ে দেয়নি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যারা এসেছে তাদের সকলকেই জায়গা করে দিয়েছেএপারের আদি অধিবাসী রাজবংশী এবং অন্যান্য জাতি উপজাতিরা উদ্বাস্তূদের আলিঙ্গন করলেন সহমর্মীতা, সম্প্রীতি এবং সমাজবদ্ধতার উষ্ণ আন্তরিকতায় সমাজবদ্ধতার এই পরম্পরা এবং ধারাবাহিকতা আজও অমলিন জলপাইগুড়ি জেলা সহ উত্তরবঙ্গের মানুষের সহজ সরল সাবলীল এবং আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ জীবন যাপনের পরিপূর্ণ ছবি পাওয়া যায় উত্তরের আনাচে কানাচে

- - - 

লেখক- গৌতম চক্রবর্তী। ডুয়ার্সের "চারণ পথিক"। প্রায় ২৫ বছর ধরে লেখালেখি এবং সাংবাদিকতা চর্চার সঙ্গে যুক্ত । জলপাইগুড়ি ধাপগঞ্জ গভর্ণমেন্ট স্পনসর্ড আশ্রম টাইপ হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক গৌতম চক্রবর্তীর লেখার উপজীব্য বিষয় ডুয়ার্স।  প্রায় ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়  বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে চলেছেন। সম্প্রতি তিনি জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৮৬ টি চা বাগান ক্ষেত্র সমীক্ষা করে সেখানকার মানুষের আর্থসামাজিক চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর শতাধিক নিবন্ধে যা "বাগিচা সফর" নামে প্রকাশিত হতে চলেছে। ডুয়ার্সের পর্যটন, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণ, জনজাতি এবং ইতিহাস চর্চা তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয়। ইতিমধ্যেই সরকারি এবং বেসরকারি বহু সম্মানে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজেও যুক্ত।


No comments

পরিযায়ী পাখিরা  ঠিকানা বদলাচ্ছে ঃ প্রসঙ্গ ডুয়ার্স       - বাসুদেব ভট্টাচার্য্য । ফি বছর শীতকালে ওরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আস্তা...

Powered by Blogger.