পরিযায়ী পাখিরা ঠিকানা বদলাচ্ছে ঃ প্রসঙ্গ ডুয়ার্স
- বাসুদেব ভট্টাচার্য্য ।
ফি বছর শীতকালে ওরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আস্তানা গাড়ত তরাই এবং ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকায়। শীত ফুরোলেই ফের ওরা ফিরে যেত নিজেদের এলাকায়। ওদের কেউ আসত রাশিয়া থেকে, কেউ আসত ইউরোপ থেকে কেউ আবার হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল থেকে। ওরা মানে পরিযায়ী পাখিরা।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এদের মধ্যে বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি, যেমন ওসপ্রে, হোয়াইট ক্যাপটড রেডস্টার্ট, ব্লু হুইসেলিং থ্রাস, এশিয়ান ব্রাউন ফ্ল্যাই ক্যাচার, গ্রে হেডেড ফ্লাই ক্যাচারের মতো পাখিরা আর ফিরছে না তাদের নিজস্ব আস্তানায়। যার মূল কারণ, তাদের পুরনো আবাসস্থলের পরিবেশগত পরিবর্তন। এরা মূলত বিভিন্ন পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় এখন ক্রমশ জনবসতি বাড়ছে যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। তাই তাদের আহারের সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের প্রজননের জন্য যেই আবহাওয়া প্রয়োজন, সেই আবহাওয়া তারা তরাই ও ডুয়ার্স এলাকায় পাচ্ছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এই পাখি গুলি গরমের শুরুতেই ফিরে যায়। কিন্তু সম্প্রতি এদের তরাই এবং ডুয়ার্সের বিভিন্ন জঙ্গল সংলগ্ন এবং জলাশয় এলাকায় সারাবছরই দেখা মিলছে। পাশাপাশি যে সমস্ত পাখি গুলি ছোট মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে সেই পাখি গুলিও পর্যাপ্ত ছোট মাছ পাচ্ছে বলেও সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এই বিষয়টি ভালো ভাবেই দেখছেন পরিবেশবিদরা। এছাড়াও এই পাখি গুলো শীত প্রধান অঞ্চলে থাকে, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় অনেক বেশী শীত পড়ছে আবার কোনো কোনো অঞ্চলে কম শীত পড়ছে। যার ফলে এরা সেই সব অঞ্চলের দিকে ফিরতে অনিহা দেখাচ্ছে। সেইসঙ্গে ডুয়ার্সের বিভিন্ন নদী সংলগ্ন এলাকা, যেমন তিস্তা, জলঢাকা, মূর্তি এবং জঙ্গল সংলগ্ন এলাকা গোরুমারা, মহানন্দা সহ অন্যান্য জঙ্গল এলাকাতেও বসবাস শুরু করেছে। এই এলাকা গুলির পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছে বলে জানান, পরিবেশ রক্ষায় বঙ্গরত্ন প্রাপক তথা পরিবেশবিদ ড: রাজা রাউত। তিনি আরো জানান, সম্প্রতি তারা পাখি নিয়ে একটি সমীক্ষা করেন সেই সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। মূলত বাস্তু তন্ত্রের কিছু পরিবর্তন হওয়ায় পরিযায়ী পাখিরাও তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। এই বিষয়টি তরাই ডুয়ার্স এলাকার পরিবেশের পক্ষে বেশ ভালো বিষয় বলে জানান ড: রাজা রাউত। পাশাপাশি তিনি আরো জানান, এবছর বেশ কিছু পাখি তাদের সঠিক আবাসস্থলের না থাকার কারণে ডুয়ার্সে আসেনি। যাওবা এসেছিলো সেগুলি ফিরে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কমন শেলডাক ( মাঙ্গোলিয়া থেকে আসে), গোল্ডেন আই (ইউরোপ), ক্রেস্টেড গ্রেড (পাকিস্তান /আফগানিস্তান) এই পাখিগুলো আসেনি।
শীতের সময় এরা প্রজনন করে, কিন্তু সঠিক পরিবেশের অভাবে তাদের প্রজননে সমস্যা হবে যার ফলে এদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসবে। তাতে বাস্তুতন্ত্রের ওপর ও প্রভাব পড়বে। এর পাশাপাশি পর্যটনেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ প্রতি বছর প্রচুর মানুষ গজোলডোবায় পাখি দেখতে আসেন। নৌকায় চড়ে তারা পাখি দেখেন, পাখির ছবি তোলেন। কিন্তু পাখি না আসায় ওই পর্যটকরাও আসবেননা। ফলে নৌকা চালিয়ে যারা পর্যটকদের পাখি দেখান তাদের রুজুরুটিতেও টান পড়বে। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশকে বাঁচানোই এখন প্রধান কাজ মানব সমাজের।লেখক পরিচিতি- বাসুদেব ভট্টাচার্য্য, জন্ম শহর- ময়নাগুড়ি, দর্জি পরিবারের সন্তান, পিতা- ঁহরিপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য, মাতা- শিবানি ভট্টাচার্য্য, গৃহবধূ, জীবনসঙ্গী- নেই, পেশা- সাংবাদিকতা, নেশা- গান বাজনা, ঘুরে বেড়ানো।

No comments