flag

flag
Dooars Day, Ours Day.

ডুয়ার্সের চা শিল্পের সার্ধশতবর্ষ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবের পটভূমি

ডুয়ার্সের চা শিল্পের সার্ধশতবর্ষ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবের পটভূমি 

                          - শুভজিৎ দত্ত।
এখানে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ বন। রকমারি পাখপাখালির মিষ্টি মধুর কলতান। হাতি, বাইসন, গন্ডার, চিতাবাঘ, চিতল হরিণ, সম্বরের মত হরেক কিসিমের বুনোদের অবাধ বিচরণ। অদূরেই ধ্যান মগ্ন মৌন পাহাড়। সাথে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির গালিচা পাতা চা বাগান। ডুয়ার্সের আইকন  সেই চা শিল্প-ই আজ গুটি গুটি পায়ে হেঁটে দেড়শো বছরের যুগ সন্ধিক্ষণে।
বলা হয়ে থাকে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা হাতে না পেলে নাকি ঘুম ভাঙে না বিশ্বের বহু দেশের। দেড়শো বছর ভারত শাসন করে যাওয়া ব্রিটিশ রাজ পরিবার কিংবা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। জেনিফার লোপেজ বা জন লেনন। তাঁদের মত আরো বহু বিশ্বজনীন দিকপালদের চা প্রীতির কথা তো কার্যত মিথ। বাঙ্গালীরাও বা কম যান কিসে। ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্রর একটি লেখা বলছে, চা পানের ইচ্ছে জাগলে লোক নিন্দার কোন কেয়ারই করতেন না স্বামী বিবেকানন্দ। তাই ১৮৮৬ সালে তাঁর পরমপিতা শ্রী রামকৃষ্ণ দেব কে সৎকারের রাতেই দরমা জ্বালিয়ে কেটলি ভরে চা খেয়েই গুরুভাইদের নিয়ে রাত কাবার করেছিলেন তিনি। 'ঠাকুরবাড়ির আঙিনা' নামে স্মৃতিকথায় বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের চা প্রীতি সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন পল্লী কবি জসিমউদ্দিন। ফরিদপুরে এক গানের আসরে গিয়ে রাতের বেলা চা না পেয়ে নজরুলের তখন প্রায় পাগল হওয়ার যোগাড়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেখানে জনৈক আলিম সাহেব এর বাড়িতে সন্ধান মেলে।
ভুটান সীমান্ত বরাবর তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত দেড়শো কিলোমিটার বিস্তৃত ডুয়ার্সে চা বাগানের গোড়াপত্তনের সার্ধশত বছরের এই সোনালী মুহুর্তের গোড়ার কথায় পাহাড়ের কথা না বললেই নয়।  সিকিমের রাজা ১৮৩৫ সালে দার্জিলিং কে ব্রিটিশ বাণিজ্য সংস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে তুলে দেয়। ১৮৫০ সালে দার্জিলিং আলাদা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সুপারিন্টেন্ড হিসেবে নিযুক্ত হন ডঃ আর্থার ডি ক্যাম্পবেল। ১৮৫৪ সালে তিনি তাঁর বাংলোতে চিনা প্রজাতির কিছু চা গাছের চারা রোপণ করেন। ওই প্রচেষ্টা সফল হওয়ার পর ১৮৫৬ সালে পাহাড়ে প্রথম গড়ে ওঠে আলুয়াবাড়ি চা বাগান। ১৮৭২ সালের মধ্যে দার্জিলিং এ একে একে ৭৪ টি চা বাগান তৈরি হওয়ার পর জমির সংকট দেখা দেয়। এরপর ব্রিটিশরা সমতলেও চা চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সমীক্ষা শুরু করে।
ইংরেজদের হাত ধরেই তরাই এর চুমটা দিয়ে শুরু হয়ে চা বাগান নেমে আসতে শুরু করে ডুয়ার্সে। ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার এর রিপোর্ট অনুসারে ১৮৭৪ সালে ডঃ ব্রাংহাম গজলডোবা তে প্রথম চা বাগান শুরু করেন। সেটি তিস্তার আগ্রাসনে তলিয়ে গেলেও ডুয়ার্সের চায়ের গর্ভগৃহ ওই বাগানের গোড়াপত্তনের কাহিনী রূপকথা হয়ে থেকে গিয়েছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। এর পর ১৮৭৫ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে একে একে গড়ে ওঠে ফুলবাড়ি (১৮৭৫), ডালিমকোট (১৮৭৬), বাগ্রাকোট (১৮৭৬), কুমলাই (১৮৭৭), ডামডিম (১৮৭৭), ওয়াশাবাড়ি (১৮৭৭), এলেনবাড়ি (১৮৭৭), মানি হোপ (১৮৭৮), পাতাবাড়ি (১৮৭৮), রাণিচেড়া-র (১৮৭৮) মত সব মিলিয়ে ১২ টি বাগান।
১৮৭৭ সালটি ডুয়ার্সের চা শিল্পে ভারতীয়দের প্রবেশের কাহিনী। জলপাইগুড়ির মুন্সি রহিম বক্স ১৮৭৭ সালের ১৭ আগস্ট জলঢাকা গ্র্যান্ট নামে চা চাষের জন্য ৭৩৮ একর জমির লিজ পান। পরের বছর কাঠ ব্যবসায়ী বাবু বিহারীলাল গঙ্গোপাধ্যায় লিজ পান আলতাডাঙ্গা গ্র্যান্টের। বর্তমানে যা জলঢাকা-আলতাডাঙ্গা চা বাগান নামে পরিচিত। ওই ১৮৭৭ সালেই বাতাবাড়ি, বামনডাঙ্গা, এলেনবাড়ি, ডামডিমের মত আরো বাগান শুরু হয়েছিল। ১৮৭৮ সালে কলাবাড়ি চা বাগান কেনেন প্রথিতযশা চিকিৎসক নীলরতন সরকার। পরে তা বিক্রি করেন তারিণী প্রসাদ রায় কে। ১৮৭৯ সালে জলপাইগুড়িতে প্রথম ভারতীয় শিল্পপতিরা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গঠন করেন। সে সময় এখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রূপে কর্মরত ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর বাবা ভগবান চন্দ্র বোস। তিনি চা শিল্পে জলপাইগুড়ির শিল্পপতিদের এগিয়ে আসতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন। তাঁরই আনুকূল্যে প্রথম পুরোপুরি ভাবে ভারতীয়দের নিয়ে গঠিত জলপাইগুড়ির টি কোম্পানি ১৮৭৯ সালে মোগলকাটা চা বাগান স্থাপনের পথে এগিয়ে আসে। জলপাইগুড়ি টি কোম্পানি লিমিটেডের ১৮৭৯ সালের ২ জুনের সভার কার্যবিবরণী থেকে পাওয়া যায় তখন চেয়ারম্যান ছিলেন জয় চন্দ্র সান্যাল। এতে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন মহিমচন্দ্র ঘোষ. গোপাল চন্দ্র ঘোষ, কেশবচন্দ্র ঘটক, রামচন্দ্র সেন, হরিশচন্দ্র অধিকারী, যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী, মদনমোহন ভৌমিক, মুন্সি নাসিরউদ্দিন মহম্মদ, শ্রীনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ।
উত্তরবঙ্গে বর্তমানে চা শিল্পের সাথে জড়িত স্থায়ী অস্থায়ী মিলিয়ে কম বেশি মানুষের সংখ্যা ২৫ লক্ষ। শ্রমিকদের প্রথম নিয়ে আসা হয়েছিল ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, সাঁওতাল পরগণার মত নানা স্থান থেকে। মূলত ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, খারিয়া, লোহার, লোহরা, মাহালির মত আরো নানা জনজাতির শ্রমিকরা শ্বাপদ শঙ্কুল এলাকায় হাড় ভাঙা খাটুনিতে  বাগানগুলি তৈরি করেন। পাশাপাশি ছিলেন তামাং, লিম্বু, রাই, ছেত্রীদের মত নেপালী সমাজ। এটা বলতেই হয় চা বাগান ছাড়া আর কোন সংগঠিত ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক মহিলা শ্রমিকের উপস্থিতি নেই।
১৮৮১ সালে গড়ে ওঠে চা বণিক সভা আইটিএ। তার আগেই ডুয়ার্সে ১৮৭৭ সালে ডুয়ার্স প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। আইটিএ-র ডুয়ার্স শাখার দপ্তর বিন্নাগুড়িতে চালু হয় ১৯৫০ সালে। ১৯১৫ সালে তারিণী প্রসাদ রায়, জ্যোতিষ চন্দ্র সান্যাল, আমিনুর রহমান, যোগেশ চন্দ্র ঘোষের মত আরো বেশ কিছু জলপাইগুড়ির শিল্পপতিরা তৈরি করেন আইটিপিএ। এটাই ছিল পুরোপুরি দেশীয় মালিকদের চা বণিকসভা।  জলপাইগুড়ির চা শিল্প নিয়ে বলতে গেলে অবধারিতভাবে উঠে আসে সত্যেন্দ্র প্রসাদ রায়, বীরেন চন্দ্র ঘোষ, সীতারাম কল্যাণী, কামিনী কান্ত রাহুত, নাথমল দাগাদের  মত প্রবাদ প্রতিম শিল্পপতিদের কথা। টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া পথ চলা শুরু করে ১৯৬৪ সালে। চায়ের ওপর গবেষণার ক্ষেত্রেও ডুয়ার্স অনন্য। নাগরাকাটায় অবস্থিত টিআরএ-র উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক উন্নয়ন ও গবেষণা কেন্দ্র নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে পাঁচের দশকের মাঝামাঝি থেকে। 
১৯৯১ সালের পর থেকে এক নতুন খাতে বইতে শুরু করে ডুয়া্র্স সহ গোটা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির জিয়নকাঠি এই শিল্প। সে বছর গৃহীত নতুন শিল্পনীতির পর জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং এর সমতল, আলিপুরদুয়ার এমনকি পরে কোচবিহার জেলাতেও সম্প্রসারিত হতে শুরু করে ক্ষুদ্র চা চাষ। বর্তমানে উত্তরবঙ্গে ক্ষুদ্র চা চাষীর সংখ্যা অন্তত ৫০ হাজার। শুধু জলপাইগুড়িতেই ২৫ হাজার। ক্ষুদ্র চা চাষীদের উৎপাদিত কাঁচা পাতার মূল ক্রেতা বটলিফ ফ্যাক্টরি। সেগুলির সংখ্যা দুশো পেরিয়ে গিয়েছে। ভাল মানের চা তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ ডুয়ার্সের বড় বাগানগুলিও কাঁচা পাতার জন্য এখন ক্ষুদ্র চাষীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শুধু কাঁচা পাতা বিক্রিতেই নিজেদের সীমিত রাখা নয়। তাঁরা গড়ে তুলেছে নিজস্ব ফ্যাক্টরিও। ভারতীয় চা পর্ষদের নিরলস সহযোগিতার কথা এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। তাঁদের অফেরতযোগ্য অনুদানে শুধু জলপাইগুড়িতেই গড়ে ওঠা ফ্যাক্টরির সংখ্যা এই মুহুর্তে ৫। স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে ২০১৩ সালে ক্ষুদ্র চা চাষীদের ময়নাগুড়ির জয় জল্পেশ স্মল টি গ্রোয়ার্স সোসাইটির ফ্যাক্টরির পথ চলা তো এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। ৫২২ জন চাষীকে নিয়ে সমবায়ের ভিত্তিতে চলা ওই জয় জল্পেশ গোটা দেশের কাছেই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ঘরোয়া বাজারে বিক্রির পাশাপাশি সেখানকার উৎপাদিত চা বিদেশে রপ্তানীরও লক্ষ্য হাতে নেওয়া হয়েছে।
দেশের মোট চা উৎপাদনের বেশিরভাগই এখন আসছে এই ক্ষুদ্র চা চাষ থেকেই। টি বোর্ডের তথ্য অনুসারে ২০২২ সালে ভারতে মোট চা উৎপাদিত হয়েছিল ১৩৬৬.৩৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম।  ২০২৩ সালে ১৩৯৩.৬৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয়েছিল ক্ষুদ্র চা চাষীদের বাগান থেকে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ডুয়ার্স- তরাইয়ে গত বছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা উৎপাদিত হয়। তার মধ্যে ক্ষুদ্র চাষীদের অবদান ছিল ৬০ শতাংশ। চলতি বছরে ওই পরিমাণ আরো বাড়তে চলেছে। সর্বোচ্চ ১০.১২ হেক্টর পর্যন্ত জমিতে সম্প্রসারিত ক্ষুদ্র চা চাষীদের বাগানই বিকল্প আয়ের নতুন সন্ধান এনে দিয়েছে উত্তরের গ্রামীন অর্থনীতিতে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত যুবকরা সরকারী সহযোগিতা ছাড়াই ক্ষুদ্র চা চাষের মাধ্যমে এখানেও ছড়িয়ে দিয়েছেন সবুজ বিপ্লব। তৈরি হয়েছে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান।
চা শিল্পের ভবিষ্যৎ কি?  এই নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। আছে আশঙ্কাও। এটা ঠিক ডুয়ার্সের বড় চা বাগানগুলি ক্রমশ অলাভজনক হয়ে যাচ্ছে। কাঁচা পাতার ন্যয্য মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ক্ষুদ্র চা চাষীদের জীবনে তো এখন অভিশাপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
পরিবর্তন ইতিহাসের নিয়ম। বড় চা বাগিচার কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছিল সময়ের তাগিদেই। ক্ষুদ্র চা চাষের বিস্তারও প্রয়োজনের নিরিখেই। আমুল বদলে যাওয়া জলবায়ু এখন এই শিল্পের কাছে  মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। সমস্যা  আরো বিবিধ।  তবুও এটা নিয়ে কোন সংশয় নেই হাজারো সংকটের ঘূর্ণাবর্তের মাঝেও চা ছিল, আছে ও থাকবে।
 - - -
  লেখক- শুভজিৎ দত্ত- পেশায় প্রাথমিক  শিক্ষক (শিক্ষারত্ন সন্মাননা প্রাপক),  নেশা- লেখালেখি, ডুয়ার্সের নাগরাকাটার ভূমি পুত্র। নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কাজের সাথেও যুক্ত। চা বলয়ের বাসিন্দা ও চা বাগানের শিক্ষক  হওয়ার সুবাদে চা শিল্প ও চা  সমাজকে তুলে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ‘সোনার কলম’- কেই হাতিয়ার করে চলেছেন।

No comments

পরিযায়ী পাখিরা  ঠিকানা বদলাচ্ছে ঃ প্রসঙ্গ ডুয়ার্স       - বাসুদেব ভট্টাচার্য্য । ফি বছর শীতকালে ওরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আস্তা...

Powered by Blogger.